চাল উৎপাদনে তৃতীয় হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

429

কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চালউৎপাদন বাড়ছে  বাংলাদেশে। মার্কিন কৃষিবিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) উৎপাদন ৩কোটি ৬০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যদিয়ে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারীহতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

দেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তুলনায় প্রায়তিন গুণ বেড়েছে চালের উৎপাদন। দীর্ঘদিনধরেই খাদ্যশস্যটি উৎপাদনে বাংলাদেশেরবৈশ্বিক অবস্থান ছিল চতুর্থ। চীন ও ভারতেরপরই তৃতীয় স্থানটি ছিল ইন্দোনেশিয়ার। তবেএবার ইন্দোনেশিয়াকে সরিয়ে সেই অবস্থানেউঠে আসছে বাংলাদেশ।

চলতি অর্থবছরে আমন মৌসুমে রেকর্ডউৎপাদন হয়েছে। আবার গত আউশ মৌসুমেওচালের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ চলতিবোরো মৌসুমে সাড়ে চার লাখ টন বাড়তেপারে চালের উৎপাদন। তিন মৌসুমে উৎপাদনবৃদ্ধির সম্মিলিত ফলাফলই বাংলাদেশ শীর্ষতিনে চলে আসার মূল কারণ বলে মনেকরছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের এ অর্জন নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুররাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, দেশেরকৃষকরাই এ অর্জনের প্রধান দাবিদার। এরসঙ্গে এ খাতে নিয়োজিত সম্প্রসারণকর্মী, বিজ্ঞানী, গবেষক ও বেসরকারি খাতেরঅবদান রয়েছে। তাদের সহায়তা করার জন্যআমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরাশুধু প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উপকরণ, আর্থিক ওনীতিসহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদেরসরকারপ্রধান কৃষি ও কৃষকদের জন্যঅন্তঃপ্রাণ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেদেশের চাল উৎপাদনে বৈশ্বিক এ সফলতাএসেছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও চালউৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে দেশে।ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেতা আবাদে লবণাক্ত, খরা ও হাওড় অঞ্চলেরকৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে এসবএলাকায় এখন একটির পরিবর্তে দুটি ধানেরআবাদ হচ্ছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটিধান করা যায় কিনা, সেটি নিয়েও ভাবছিআমরা। এবার হাওড়ের ধান কাটায় সফলতারজন্য যান্ত্রিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকের জন্যআর্থিক প্রণোদনা থেকে শুরু করে বিপণন, সরবরাহ ও উপকরণের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়ারচেষ্টা করছি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদেরখাদ্যশস্যের চাহিদা নিজেদের উৎপাদনেরমাধ্যমেই পূরণ করতে হবে।

বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সর্বশেষতথ্য নিয়ে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেচাল উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় হওয়ার এপূর্বাভাস দিয়েছে ইউএসডিএ। প্রতিবেদনেবৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সঙ্গেবাংলাদেশের বেশ কয়েকটি কৃষিপণ্যেরউৎপাদনের তুলনা করা হয়েছে।

ইউএসডিএর প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারা বিশ্বে ৫০ কোটি২০ লাখ টন ছাড়াতে পারে চালের উৎপাদন, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি।চীন সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন করবে।দেশটি চলতি অর্থবছরে ১৪ কোটি ৯০ লাখটন চাল উৎপাদনের মাধ্যমে শীর্ষে অবস্থানকরবে। চীনের পরই আছে পার্শ্ববর্তী দেশভারত। দেশটির চাল উৎপাদন দাঁড়াবে ১১কোটি ৮০ লাখ টন। এর পরই ৩ কোটি ৬০লাখ টন উৎপাদন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে উঠেআসবে বাংলাদেশ। আর দীর্ঘদিন ধরেই তিননম্বর স্থানটি দখলে রাখা ইন্দোনেশিয়া এবারচতুর্থ অবস্থানে নেমে আসবে। দেশটিতে চালেরউৎপাদন হবে ৩ কোটি ৪৯ লাখ টন।

দেশের উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশিআসে বোরো ধান থেকে। বাকিটা আসে আউশও আমন থেকে। দেশের জমিগুলোতে বছরেএকই জমিতে তিনবার ধান উৎপাদন করা হয়।বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকা ধান আবাদের আওতায়আনা হচ্ছে। এ অঞ্চলের উপযোগী ধানের জাতসম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।চলতি মৌসুমে হাওড় এলাকায় ধানের বাম্পারফলনের মাধ্যমে দেশের চালের উৎপাদনেএকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বণিক বার্তাকেবলেন, চলতি অর্থবছরের আমন মৌসুমেরেকর্ড উৎপাদন পেয়েছি। আবার চলতি বোরোমৌসুমে এখন পর্যন্ত আবহাওয়া স্বস্তিদায়কঅবস্থানে রয়েছে। হাওড়ের শতভাগ ধান কাটাপ্রায় সম্পন্ন। একটা মাস ভালো আবহাওয়াপাওয়া গেলে বোরোতে রেকর্ড উৎপাদন হবে।আবার আগামী মৌসুমের জন্য আউশেরব্যাপক প্রণোদনা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।ফলে সেখানেও উৎপাদন কয়েক লাখ টন বৃদ্ধিকরতে সক্ষম হব। ফলে চাল নিয়ে ইউএসডিএযদি এ ধরনের প্রক্ষেপণ দিয়ে থাকে তবেসেটা যথার্থই হয়েছে। যদিও এখনো আমরাপ্রতিবেদনটি হাতে পাইনি।

ইউএসডিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার চালউৎপাদনের শীর্ষ ১২টি দেশের মধ্যেইন্দোনেশিয়ার পরই থাকছে ভিয়েতনাম।দেশটিতে এবার উৎপাদন দাঁড়াবে ২ কোটি৭৫ লাখ টন। এছাড়া থাইল্যান্ডে ২ কোটি ৪লাখ টন, মিয়ানমারে ১ কোটি ৩১ লাখ টন, ফিলিপাইনে ১ কোটি ১০ লাখ টন, জাপানে৭৬ লাখ ৫০ হাজার টন, পাকিস্তানে ৭৫ লাখটন, ব্রাজিলে ৬৯ লাখ ও কম্বোডিয়ার প্রায় ৫৮লাখ টন চাল উৎপাদন হবে।  ইন্দোনেশিয়াচলতি বছর খারাপ পরিস্থিতির কারণেউৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। তবে সামনেরবছরে দেশটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তখনবাংলাদেশের জন্য তৃতীয় স্থান ধরে রাখাটাচ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক এপ্রসঙ্গে বলেন, কয়েক বছর ধরেই দেশেচালের উৎপাদনে একটি ধারাবাহিকতা আছে।সেটার কারণেই বাংলাদেশের উল্লম্ফনটাএসেছে। তবে সেটি ধরে রাখতে হবে। অর্জনটাধরে রাখতে হলে কৃষি খাতে গবেষণা যেমনবাড়াতে হবে, তেমনি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতেহবে। উন্নত মানের বীজ সরবরাহ বাড়াতেহবে, কৃষকের ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিতকরতে হবে। শুধু জাত উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধথাকলে হবে না। সেগুলোকে কৃষকের কাছেজনপ্রিয় করতে হবে। ধানের স্টোরেজ ব্যবস্থায়সংস্কার প্রয়োজন। বিপণন ব্যবস্থায় মিলারদেরওপর নির্ভরশীল না হয়ে কৃষক ও সরকারকেআরো শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে।উৎপাদনে কৃষকের খরচ কমিয়ে আনা এবংবিপণন ব্যবস্থায় আরো পদক্ষেপ নিলেই ধরেরাখা যাবে এ অবস্থান।

 চাল উৎপাদনে শীর্ষ ১২ দেশ

 দেশ        উৎপাদন               

চীন         ১৪৯        

ভারত      ১১৮        

বাংলাদেশ               ৩৬.০     

ইন্দোনেশিয়া          ৩৪.৯      

ভিয়েতনাম             ২৭.৫      

থাইল্যান্ড                ২০.৪      

মিয়ানমার               ১৩.১       

ফিলিপাইন             ১১.০       

জাপান   ৭.৬৫     

পাকিস্তান               ৭.৫০      

ব্রাজিল    ৬.৮৭     

কম্বোডিয়া               ৫.৭০      

(উৎপাদন=মিলিয়িন টন)

 সূত্র: ইউএসডিএ